উপেক্ষিত বীরাঙ্গনা স্বীকৃতির আগেই বিদায়
০৮ এপ্রিল, ২০২০ ১০:৪১ পূর্বাহ্ন


  

  • তাড়াশ/ আমাদের মুক্তিযুদ্ধ:

    উপেক্ষিত বীরাঙ্গনা স্বীকৃতির আগেই বিদায়
    ০৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২০ ১১:৫১ পূর্বাহ্ন প্রকাশিত

    আশরাফুল ইসলাম রনি: 
    আশানবাড়ী গ্রামের কানায় কানায় তখন বন্যার পানি। অবশ্য ১৯৭১ সালে সাড়া দেশ জুরেই বন্যা। তখন যারা তরুণ-যুবক তাদের হাতে কাজ নেই। স্কুল কলেজ বন্ধ। খেলাধুলার জায়গাও ডুবে গেছে। কোথাও বেড়াতে যাওয়ার উপায় নেই। কেননা মুক্তিযুদ্ধ চলছে। চারিদিকে বেশী বাড়বাড়ন্ত রাজাকার আলবদর বাহিনীর। তাদের হাতে ধরা পড়লে আর রক্ষা নেই। অবশ্য, তাড়াশ অঞ্চলে মুক্তিবাহিনীর প্রকাশ্য তেমন তৎপরতা তখনো শুরু হয়নি। তবে তাড়াশ সদরে এরই মধ্যে পাক বাহিনী জমজমাট আখড়া বসিয়েছে। ওদের মদদ যোগাচ্ছে আর সহায়তা করছে স্থানীয় শান্তি কমিটি ও রাজাকারের দল। তারাও সেখানে আস্তানা গেড়েছে ওদের পাশাপাশি। তারা পাক সেনাদের সবচেয়ে বড় বিশ^স্ত সহযোগী, ঘনিষ্ঠ দোসর মানে দালাল। গোটা এলাকায় যত অকাম, কুকাম নির্বিচারে করে চলেছে এই কুলঙ্গাররা। সার্বিক সহায়তা ও সমর্থন পাচ্ছে স্থানীয় শান্তি কমিটি ও পাক বাহিনীর তরফ থেকে। বলা যায় ততদিনে রাজাকাররা রাম রাজত্ব কায়েম করে বসেছে গোটা এলাকায়। বহিরাগত পাক সেনা ও স্থানীয় রাজাকাররা যৌথভাবে লুটপাট, মানুষ নির্যাতন, খুন, ধর্ষণ সহ ব্যাপক নৈরাজ্য তথা নারকীয় যজ্ঞ কায়েম করে চলেছে। সাধারণ জনজীবন অতিষ্ঠ, দুর্বিসহ  এমনকি দিশেহারা হয়ে পড়েছে। 
    এমনটা বলছিলেন সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার আসানবাড়ি গ্রামের প্রবীন ব্যাক্তি তাড়াশ প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ও বেসরকারী সংস্থা পরিবর্তন এর পরিচালক আব্দুর রাজ্জাক রাজু। 
    তার সাথে আলাপকালে জানান, এমনি কঠিন দু:সময়ের প্রেক্ষাপটে সেদিন বেলা আনুমানিক দুপুরের দিকে দু’একজন প্রতিবেশী তরুণের সাথে আমি গভীর নেশায় মার্বেল খেলায় মত্ত। তখন তিনি ছোট বেলায় যেমন, বড় হয়ে হাইস্কুল ছাত্র জীবনেও অনুরুপ মার্বেল খেলায় অনেকটা আসক্ত ছিলেন। এ নিয়ে মা বাবার আপত্তি-অভিযোগই শুধু ছিল না , এমনকি  একারণে তাদের হাতের পিটুনিও খেতে হয়েছে মাঝে-মাঝেই। তা বলে দুর্বার আকর্ষণের মার্বেল ছাড়িনি। এছাড়া ওই বানবন্যা ও দু:সময়ের মাঝে গ্রামের ছেলেমেয়েদের কোথাও যাবার যেহেতু সুযোগ ছিল না; তাই অনন্যপায় হয়ে মার্বেল খেলায় প্রায়ই আমরা সময় কাটাতাম। এসময় পিতা বা পাড়ার মুরুব্বীরা দেখা সত্বেও আমাদেরকে সেরকম শাসন না করে ছাড় দিয়ে চলতো। অন্য কারণ হল , মুক্তিযুদ্ধের ডামাডোলে পড়া লেখাও বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে স্কুল ও পাঠ্য পুস্তকের ব্যাপারটাও আপাতত স্থগিত। দেশের সেই বিভিষিকাময় পরিস্থিতিতে দারুন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে লেখাপড়ার মানসিকতা থাকার কথা নয়।
    যাহোক, সেময় আমরা মার্বেল খেলতেছিলাম গ্রামের মফিজ উদ্দীন তালুকদারের বড়সড় উঠানে। তালুকদারকে আমি মামা বলে ডাকতাম। এটা আমাদের গ্রামের উত্তর-দক্ষিণ পাড়ার পূর্বকোনে অবস্থিত বাড়ি। সেখান থেকে তাড়াশের দিকে যতদূর নজর যায়- কেবলি পানি আর পানি। মাঝে মাঝে পাল তোলা, লগি ঠেলা বা দাঁড় টানা নৌকার দেখা মেলে। চারিদিকে ভয়াবহ সন্ত্রাস, ধরপাকর এমনকি হত্যা-হানাহানির খবর। তাই সেই অতি বন্যায়ও মানুষ নৌকায় চলে কম। চতুর্দিকে দুর্যোগের ঘনঘটা। বাড়ী থেকে বের হলেই আতংক আর আশংকা।জীবনের কোনো ভরসা নেই। অনিরাপদ তথা নিরাপত্তাহীন নৈরাজ্যকর ভয়ের পরিবেশ চারিদিকে। কোথায় কখন কী দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে তার ঠিক নেই।
    এমনি মুহুর্তে আমাদের এক খেলার সাথী একটু সন্ত্রস্থ হয়ে দৌড়ে এসে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার সাথে  জানালো, তাড়াশের দিক থেকে একটা গুদামের নৌকা আমাদের গ্রামের দিকে আসছে। পাল তোলা ছাড়াও নৌকার সামনে লম্বা লগি হাতে দ’ুজন দাঁড়িয়ে আছে। তবে নৌকা যতই এগিয়ে আসছে তাতে স্পষ্ট হচ্ছে- গুদামের উপর সম্ভবত অস্ত্রধারী খাকী পোশাকের মিলিটারী বসে ও দাঁড়িয়ে আছে বলে মনে হচ্ছে। আমরা মুহুর্তেই খেলা বাদ দিয়ে এগিয়ে গেলাম দক্ষিণ পাড়ার পশ্চিম মাথায় ফজলুর রহমান হেডমাষ্টার ভাইয়ের বাড়ীর ওদিকে আরো ভালভাবে দেখার জন্য। কারণ নৌকাটা ওধার হয়েই ঢুকবে বলে মনে হচ্ছে। সেখানে গ্রামের বড়ছোট আরো কিছু লোকজনও জুটে গেল ততক্ষণে। হাঁ, তাইতো, বজরা ধরনের নৌকায় পাকসেনা ও রাজাকারদের দেখা যাচ্ছে। এতক্ষণে নৌকা গ্রামের কাছাকাছি চলে এসেছে। আমাদের কবরস্থান-মসজিদ পুকুরের একবারে নিকটে প্রায়। যদিও পুকুরটি বন্যার জলে ডুবে গেছে। আর দেরি নয়- নিমিষেই ভো-দৌড় সবাই। যার যার মতো নিজের জীবন নিয়ে ভয়ে পালাতে থাকলো। এটা সত্যি, আশানবাড়ীতে এই প্রথম পাকবাহিনীর আগমন। অবশ্য রাজাকার-আলবদররা ইতোমধ্যে গ্রামেএসে ঘুরে গেছে কয়েকবার। যদিও তাড়াশের খুব সন্নিকটবর্তী হওয়ায় সন্দেহ ছিল যে, পাক মিলিটারী বাহিনি যেকোনো মুহুর্তে এ গ্রামে আসতে পারে। সে অনুমানই আজ বুঝি সত্যি আর বাস্তব হল। ওদের নৌকাটি গ্রামের পশ্চিম পাড়ায় ভিড়ল। লক্ষ্য করলাম, আমার সাথে সমবেত সবাই পূর্ব পাড়ায় পালাতে দৌড়াচ্ছে। তৎকালে আশানবাড়ী গ্রামটা ছিল একটা পুকুরের তিন পাড়ে বসতি। উত্তর পাড়ে তখনো বসতি স্থাপিত হয় নি। অত্যন্ত ভীত সন্ত্রস্থ অবস্থায় এসে আমাদের বাড়ীতে(পূর্ব পাড়ার উত্তরে) প্রথমে টিনের চালা মাটির দেয়াল ঘরের দোতলায় উঠে  কয়েকজন বিড়ালের মতো লুƒকালাম। বাড়ীর অন্যরাও ইতোমধ্যে গা ঢাকা দিয়েছে যার যার মত। বেশটা সময় যায়, কোন সাড়া শব্দ পাই না, কেউ কিছু বলে না।আমার বাবা-মা’রা কে কোথায় লুকিয়েছে কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। এমনটাই শ^াসরূদ্ধকর ত্রাসের অবস্থা। এমনকি কেউ কারে ডাকবে উচ্চ কণ্ঠে বা শব্দে সেরকম নির্ভয় পরিবেশও ছিল না। যাকে বলে ভয়াবহ পরিস্থিতি।
    এমতাবস্থায় আমরা কিছুক্ষণ পর নীচে নেমে এলাম খুব সন্তর্পনে। তৎক্ষনাৎ সবাই বলতে থাকলো, পশ্চিম পাড়ায় চিৎকার শোনা যায়। কোন অঘটন ঘটে গেছে মনে হয়। হয়তো মিলিটারীরা কোন কিছু দুস্কর্ম বা দুর্ঘটনা করেছে। আগে দক্ষিণ পাড়ায় গিয়ে দেখো, দুস্যরা যদি চলে গিয়ে থাকে, তবে পশ্চিম পাড়ায় গিয়ে জানা যেতে পারে, প্রকৃত কী ঘটনা ঘটেছে। অবশ্য কোন আগুন দেখা যাচ্ছে না। যেই কথা সেই কাজ। ক’জনা এস খবর দিল, মিলিটারীর নৌকা গ্রাম ছেড়ে পূনরায় তাড়াশের দিকে ফিরে যাচ্ছে দ্রæত গতিতে। তাহলে তো পশ্চিম পাড়ায় গিয়ে খোঁজ খবর নেওয়া যায়। সে সংবাদ নেওয়ার পূর্বেই গ্রামময় দু:সংবাদ রটে গেল, শব্দের আলীর স্ত্রীকে পাক মিলিটারীরা ধর্ষণ করেছে। সে এখনও অজ্ঞান পড়ে আছে। সাড়া গ্রামের লোকজন সেখানে যাচ্ছে। অতএব চলো যাই ওপাড়ায়। যা কল্পনা করা যায় না, এমন মর্মবিদারক ঘটনা শোনা কিংবা প্রত্যক্ষ করা বড় বেদনাদায়ক, কঠিন। তবু সেই উত্তাল দিনের টালমাটাল পরিস্থিতিতে নিজেদের সংবরণ করা ছাড়া কোন উপায় ছিল না।
    এক পর্যায়ে নৌকায় আমরা পাড়ি জমালাম পশ্চিম পাড়াতে। যে শব্দের আলীর সহধর্মিনীকে ওরা লাঞ্ছিত করেছে তিনি আমার আপন মামা। অর্থাৎ আমার পিতার আপন বড় শ্যালক। আমার সৎমাতা বা ছোট মা ছিলেন এই শব্দেরের বড় বোন। তাই মামা-মামী দু’জনই আমদের অতি শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন। মামী ছিলেন বিনসাড়া গ্রামের আবুল কাশেমের বোন। কাশেম মামা এখনো বিনসাড়া হাটে ঢোবের দোকানের ক্ষুদে ব্যবসায়ী। মামার তখন দুই মেয়ে ও এক ছেলে। তিনি ছিলেন ভূমিহীন। মামীমা মালেকা বেগম ছিলেন বেশ সুন্দরী ও সরল প্রকৃতির। তারা কোন লেখাপড়া জানতো না। জানতে পেলাম, মামা বর্ষার পানিতে নৌকায় মাছ ধরতে ওই সময় বাইরে গিয়েছিলেন। আসলে পেশায় তিনি জেলে না হলেও আজীবনই মাছ ধরে বিক্রয় করে তিনি সংসার চালাতেন। ছেলেমেয়েরাও সে মুহুর্তে অন্যত্র গিয়েছিল। বাড়ীতে মামীমা একাকী যখন দুপুরের রান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনি পাক সেনারা হঠাৎ করেই ঢুকে পড়ে বাড়ীর ভেতর। সে চিৎকার দেওয়ার পূর্বেই আকস্মিকভাবে তাকে জোড়পূর্বক ধরে সম্ভবত গণ ধর্ষণ চালায় পাকিস্তানী সেনারা। প্রত্যক্ষদর্শী প্রতিবেশীরা জানালো, রাজাকার ও পাকবাহিনীর কতিপয় সদস্য সে সময় ওই বাড়ী ও পাড়ার বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ায় নিযুক্ত ছিল। তাদের দেখে ভয়ে কেউই বাড়ীর বাইরে যেতে বা প্রতিবাদ করতে সাহস পায়নি। ইতোমধ্যে তাদের মিশন সম্পন্ন করে বাহিনীর লোকেরা যখন নৌকায় তাড়াশে ফিরে যেতে থাকে, ইত্যবসরে পাড়ার লোকজন এসে মামীকে অচেতন রক্তাক্ত অবস্থায় কাপড়ে আবৃত নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখতে পায়। আমরা যখন সেখানে পৌছি, তখনো তার মাথায় পানি ঢালা হচ্ছে। কিন্তু কিছুতেই তার চেতনা ফিরছে না। প্রতিবেশী মেয়েরা নানা উপায়ে তাকে সেবা দিয়ে তার জ্ঞান ফিরানোর চেষ্টা করছে। তথাপি তার স্বাভাবিক সম্বিৎ ফিরে আসছে না। মুরুব্বী মেয়েরা মানে আমাদের চাচী-খালারা সব পুরুষ লোকদের ওখান থেকে চলে যেতে বলল।কিন্তু খুবই মর্ম পীড়াদায়ক ব্যাপার ছিল যে, তাড়াশ বা অন্য কোথাও তাকে চিকিৎসা কিম্বা প্রয়োজনীয় সেবাদানের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাবার মত আদৌ কোন অনুকুল পরিবেশ-পরিস্থিতি বিদ্যমান ছিল না। সুতরাং  তাকে অজ্ঞান-অচেতন রেখেই অশ্রæসজল চোখে আমাদের চলে আসতে হল। সে আসার মধ্যে কত যে দু:খ, কত যে বেদনা আর নিরব ক্ষোভ-বিক্ষোভ তা বলে বুঝাবার নয়। পরের কাহিনী আরো মর্মান্তিক ও বেদনাবিধুর। কিছুকাল পর এক পর্যায়ে মামী সুস্থ হয়ে উঠলেন। কিন্তু তার শরীর আর ভাল হল না। রুগ্ন শরীর ও ভগ্ন হৃদয়ে শুধুই দিনরাত একাকী ঝিমায় ও নির্বাক প্রহর কাটায়। তার অসহায়ত্ব ও অন্তজর্¦ালা কারো কাছে ব্যক্ত করতেন না। পরিবারের স্বামী, ছেলে-মেয়ে কারো সাথেই আর খোলামেলা কথাবার্তা বা আলাপচারিতায় যায় না সে। যেন গুমরে মরেন একান্তভাবে নিজের মধ্যেই। তার সে দহন জ¦ালা বোধ করি কারো সাথেই শেয়ার করতে পারেন নি কখনো। আমার মামা ছিলেন নিরক্ষর মানুষ। আধুনিক ধ্যান ধারনার প্রশ্নই ওঠে না। তিনি ধর্ষিতা স্ত্রীর সান্নিধ্যে যাবেন না। তাকে নিয়ে আর ঘর-সংসার করার মানসিকতা নেই- এমনটাই আকারে - ইঙ্গিতে আত্মীয় স্বজনদের জানিয়ে দিলেন। ফলে তাদের দাম্পত্য জীবনে শুরু হল আরেক শোকাবহ জীবনযাপনের যন্ত্রনাদায়ক অধ্যায়। মামী আগে থেকেই অন্ত:সত্বা ছিলেন।তার কোলে এল এক সুন্দর কণ্যা সন্তান। তার নাম রাখা হল লীমা। সে আজ আমাদের পাশেই আছে। কিন্তু মামা বলে বসলেন, এ মেয়ে আমার নয়। তার কথার অন্তর্নিহিত ইঙ্গিত দুর্বোধ্য নয়। তবে এটাও সত্য, মামী তো সন্তান সম্ভবা ছিলেন দুর্ঘটনার পূর্ব থেকেই। তবুও তিনি মামীর সাথে আবার ব্যবধান বাড়াতে থাকলেন। বিষয়টি নিয়ে পাড়া-প্রতিবেশী, মামী মা’র বাবার বাড়ীর লোকজন, আত্মীয়-স্বজন সবাই নিবিরভাবে, প্রাণান্তকর বোঝানোর চেষ্টা করলেন মামাকে অনেক দিন ধরে। যদিও গ্রামীণ সমাজে এটাকে ঘিরে অবজ্ঞা-উপেক্ষাও কম ছিল না। তারা বললেন, খামোশ হওয়ার জন্য, খাপ খাইয়ে নিতে এবং অতীত ভুলে গিয়ে সহজ ও স্বাভাবিকভাবে মামীকে মেনে নিতে। সবাই যুক্তি দিলো যার মর্ম এরকম, তোমার বউ এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ নির্দোষ, সে নিরপরাধী, এমনকি নিস্পাপ। আল্লাহ্র কাছে তার কোন দোষ বা অপরাধ হবে না এক্ষেত্রে। কারণ , পশুরা পাশবিক কৌশলে তার ইচ্ছা ও সম্মতির বাইরে, তাকে জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ফেলে এই লোমহর্ষক, অমানবিক ও বর্বরোচিত নির্যাতন করেছে। এখানে তাকে অভিযুক্ত করা হবে অত্যন্ত অবিচারের কাজ। সাড়া দেশেই অনুরুপ অগনিত, অসংখ্য নারী নিপীড়িত হয়েছে, সম্ভ্রম বিনষ্ট হয়েছে। তাই বলে এসব অসহায় নারীকে অপবাদ দিয়ে অপরাধী সাব্যস্ত করা কিছুতেই  সমিচীন হবে না। তাদেরকে মূল্যায়ন করতে হবে ভিন্ন্ভাবে। বরং তাদের প্রতি সম্মান ও মর্যাদা প্রদর্শন করা আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য। এসব নারীদের জীবন ও ইজ্জত মহান স্বাধীনতার জন্য উৎসর্গিত হয়েছে বলে আমাদের বিবেচনা করতে হবে। ৭১ সাল থেকে ৯০ দশকের শেষাবধি এই দ্বিধা-দ্ব›দ্ব চলতে চলতে  বিষয়টি এক সময়ে একটু স্তিমিত বা হালকা হয়ে গেল। এ পর্যায়ে মামা কিছুটা নমনীয় ও সহানভূতিশীল হয়ে আবার সম্প্রীতির আবহে দাম্পত্য জীবনের সংসার চালাতে থাকেন সমাজে এমনটাই প্রতীয়মান হল। বাইরে থেকে উভয়ের মধ্যে তেমনটা মনভারাক্রান্ত ভাব ও ব্যবধানের ছায়াপাত বুঝা যেত না। অস্বাভাবিক সব কিছু যেন ধীরে ধীরে স্বভাবিক হয়ে এল। কিন্তু আমরা ঘনিষ্ট আত্মীয়-স্বজন সু²ভাবে লক্ষ্য করেছি, মামা-মামী আমৃত্যু আর কোন দিন স্বতস্ফুর্ত গভীর আন্তরিক মায়াময় সংস্পর্শে মধুময় জীবন যাপনে ফিরে আসতে পারেন নি পারস্পারিক সন্দেহ-সংশয় ও ঘৃনা মুছে ফেলে। এরপর ২০০০ সালের পরবর্তী কোন এক সময়ে প্রথমে মামীমা মারা যাবার বছর দুয়েক পরে মামাও মৃত্যু বরণ করেন। চরম দারিদ্রের মধ্যেই তাদের পারিবারিক সাড়াটি জীবন কেটেছে। সমাজের নতুন প্রজন্মের কারো এ ঘটনা জানা নেই। সরকার মাত্র কয়েক বছর আগে মুক্তিযুদ্ধকালে নির্যাতিতা নারীদের বীরাঙ্গনা খেতাব ও ভাতা চালু করেছে। সেই সূত্রে সদ্য তালিকাভূক্ত তাড়াশের দু’জন বীরাঙ্গনার মধ্যে একজন প্রয়াত। কিন্তু আশানবাড়ীর এই মহান বীরাঙ্গনা যেহেতু সরকারী স্বীকৃতির পূর্বেই পরলোকে বিদায় হয়েছেন তাই তার বা তার পরিবারের ভাগ্যে এই সম্মাননা ও সুযোগ-সুবিধা জোটে নাই। তাছাড়া মামীর মৃত্যুর পরে তাদের অজ্ঞতা অথবা সামাজিক চক্ষু লজ্জার কারণেও মনে হয় তার প্রসঙ্গটি নিয়ে কেউ এ ধরনের চেষ্টা করেনি। আর তাড়াশ উপজেলা বীরাঙ্গনা বাছাই কমিটি কর্তৃক গত ২০১৮ সালে  মাত্র তিনজন বীরাঙ্গনা নারীকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দানের পর তাদের নামে সরকারী গেজেট প্রকাশ পেয়েছে। তারপর এই কমিটি আর কোন অনুসন্ধানী কাজ না করায় তাড়াশ উপজেলার অনেক বীরাঙ্গনার নাম-পরিচয় অনুদঘাটিত এবং অনাবিস্কৃতই থেকে গেল যা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক বলতে হবে বলে জানান তিনি। 

     

    স্টাফ করেস্পন্ডেন্ট, তাড়াশ ০৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২০ ১১:৫১ পূর্বাহ্ন প্রকাশিত হয়েছে এবং 277 বার দেখা হয়েছে।
    পাঠকের ফেসবুক মন্তব্যঃ
    তাড়াশ অন্যান্য খবরসমুহ
    সর্বশেষ আপডেট
    বিশ্বকাপ ক্রিকেট
    নিউজ আর্কাইভ
    ফেসবুকে সিরাজগঞ্জ কণ্ঠঃ
    বিজ্ঞাপন
    সিরাজগঞ্জ কণ্ঠঃ ফোকাস
    • সর্বাধিক পঠিত
    • সর্বশেষ প্রকাশিত
    বিজ্ঞাপন

    ভিজিটর সংখ্যা
    13309357
    ০৮ এপ্রিল, ২০২০ ১০:৪১ পূর্বাহ্ন