বাংলাদেশে এসিড সন্ত্রাসের ঘটনায় শাহজাদপুরসহ সিরাজগঞ্জ শীর্ষে!
২১ অক্টোবর, ২০১৯ ০৬:০৪ পূর্বাহ্ন


  

  • জাতীয়/ অপরাধ:

    বাংলাদেশে এসিড সন্ত্রাসের ঘটনায় শাহজাদপুরসহ সিরাজগঞ্জ শীর্ষে!
    ২৮ জুলাই, ২০১৯ ০৫:৩৯ অপরাহ্ন প্রকাশিত

    শামছুর রহমান শিশির, স্টাফ রিপোর্টার: দেশের তাঁতশিল্পের কেন্দ্রবিন্দু সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরসহ তাঁতসমৃদ্ধ সিরাজগঞ্জ জেলায় আইনের তোয়াক্কা না করে অধে চলছে এসিডে বেচাকেনা। অপব্যবহারজনিত কারণে এসিডের ভয়াবহতা একদিকে যেমন বাড়ছে অন্যদিকে এসিডদগ্ধ নারী পুরুষের জীবন এখন বিভিষিকময় । ২০০২ সালের এসিড নিয়ন্ত্রন আইন মোতাবেক লাইসেন্স ব্যাতিত এসিডের উৎপাদন, আমদানী, পরিবহন, মজুদ, বিক্রয় ও ব্যবহারে দন্ডবিধির বিধান থাকলেও নিয়মিত তদারকির অভাবে বাস্তবে তার উল্টো চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে। বড় বড় এসিড বিক্রয়ের দোকনগুলোর লাইসেন্স থাকলেও তাঁতশিল্পের কাজে ব্যাপক ভিত্তিতে এসিড ব্যবহৃত হওয়ায় ওইসব দোকানগুলো ছাড়াও লাইসেন্সবিহীন অনেক ছোট ছোট দোকানগুলোতে এমনকি ব্যাক্তি পর্যায়েও এসিড অবাধে ক্রয়-বিক্রয় করা হচ্ছে। এসিডের সিংহভাগ ক্রেতাদেরই এসিড ব্যবহারের লাইসেন্স নেই বলে জানা গেছে। ফলশ্রুতিতে, শাহজাদপুরসহ সিরাজগঞ্জের তাঁতসমৃদ্ধ এলাকায় এসিডের ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ায় এসিড সস্ত্রাসও বেড়ে গেছে। এসিডের ব্যবহারের পাশাপাশি বিক্রেতাদের সংখ্যাও দিন দিন বেড়েই চলেছে। ফলে হাত বাড়ালেই পাওয়া যাচ্ছে ঘাতক এসিড। অতীতে যে হারে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে শত্রুতাবশতঃ অনেকের শরীরে এসিড নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে ওই ধরনের ঘটনার মাত্রা আরও বেড়েছে। এ পর্যন্ত যারা এসিড সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন তাদের জীবনযাপন কতটা যে দুর্বিসহ হয়ে উঠেছে তা বাস্তবে না দেখলে বোঝার কোন উপায় নেই। শাহজাদপুরসহ সিরাজগঞ্জে এসিডদগ্ধদের অবয়ব ও ঝলসে যাওয়া শরীরের বিকৃত আকারজনিত কারণে সর্বক্ষেত্রেই স্বাভাবিক জনমানুষের কাছে তারা হেয় প্রতিপন্ন হচ্ছে এবং সামাজিকভাবে চির অবহেলিত, চির পতিত, চির অপাঙ্ক্তেয় ওইসব এসিডদগ্ধ নারী পুরুষের বিচারের বাণী নিরবে নিভৃতে কাঁদছে! তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, তাঁতশিল্পসমৃদ্ধ শাহজাদপুরসহ সিরাজগঞ্জের তাঁতশিল্পের কাজে অধিক পরিমানে এাসিড ব্যবহৃত হচ্ছে। শাহজাদপুরসহ এর আশেপাশের এলাকার তাঁতশিল্পের কাজ ছাড়াও জুয়েলারী শিল্প এবং ব্যাটারী শিল্পে এসিডের বহুল ব্যবহার পরিলক্ষিত হচ্ছে। এসব এসিড ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার ছাড়িয়ে যাবে। এ এলাকার এসিড ব্যবসার সাথে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত রয়েছে প্রায় ৮’শ ব্যবসায়ী। আর খুচরা বিক্রেতার সংখ্যা অগণিত। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষোভাবে এসিড ব্যবহারের সাথে জড়িত ওইসব ক্রেতা বিক্রেতাদের সিংহভাগই লাইসেন্স সংক্রান্ত নিয়মকানুন না মানায় খুব সহজেই যে কোন স্থানে এসিড পাওয়া যাচ্ছে। এসিডের সহজপ্রাপ্যতা এবং মূল্য হাতের নাগালে থাকায় প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে এখোনো গ্রামে গঞ্জে এসিডকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এসিড নিয়ে যখন পত্র পত্রিকায় লেখালেখি হয় তখন প্রশাসন নড়ে চড়ে ওঠে। দুই চারদিন দুইচার স্থানে অভিযান চালানো এবং নিয়মিত নজরদারী করা হলেও কদিন পর থেকে ক্রমেই ঢিলেতামে চলতে থাকে নিয়মিত নজরদারী। আর ওই সুযোগে অসাধু এসিড ব্যবসায়ীরা আবার মাথাচারা দিয়ে ওঠায় একই অবস্থা চলতে থাকে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর। ফলে কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। সংশিষ্ট একটি সূত্রে জানা যায়, গত ২০১০ সালের ৬ অক্টোবর পর্যন্ত শাহজাদপুরসহ সিরাজগঞ্জ জেলায় লাইসেন্স ছিল ৩১ জন এসিড ব্যবসায়ীর। মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে লাইসেন্সকৃত এডিস ব্যবসায়ীর সংখ্যা বেড়ে দাড়ায় ৮১ জনে। পরবর্তীতে কাগজে কলমে এসিড ব্যবসায়ীর সংখ্যা স্থিতি থাকলেও বাস্তবে এসিড ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি এসিড ব্যবহারকারীদের সংখ্যা উদ্বেগজনকহারে বেড়েছে। এসিড সারভাইভাস্ ফাউন্ডেশানের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন এনজিও প্রতিনিধিদের দেয়া তথ্যসূত্রে জানা যায়, গত ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত শাহজাদপুরসহ সিরাজগঞ্জ জেলায় ৯৯টি এসিড সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে ২০০৮ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত মাত্র ৩ বছরে ৬৪ টি এসিড সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটে। উক্ত পরিসংখ্যানুসারে ওই সময়ে প্রতি মাসে প্রায় দুইজন এসিড সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন। পরবর্তীতে জেলা এসিড নিয়ন্ত্রণ কমিটির হিসাবানুযায়ী শাহজাদপুরসহ সিরাজগঞ্জ জেলায় ১’শ ৬৩টি এসিড সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটেছে। গত ২০০৮ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি স্বামীর গৃহে ঘুমন্ত অবস্থায় শাহজাদপুর উপজেলার গালা ইউনিয়নের বড় দুগালী গ্রামের নীলা (২৫) নামক এক গৃহবধু বিদেশ যেতে অপারগতা প্রকাশ করায় ঘুমন্ত অবস্থায় স্বামী কর্তৃক এসিড দগ্ধের শিকার হন। নিক্ষিপ্ত এসিডে তার চোখ ও মুখ ঝলসে যায়। পরের বছর ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শাহজাদপুর উপজেলার পোরজনা ইউনিয়নের বাছড়া গ্রামে জমিজমা সংক্রান্ত পূর্ব বিরোধের জের ধরে ফরহাদ আলী নামের এক ব্যাক্তিকে এসিড নিক্ষেপ করা হয়। এসিড নিক্ষেপের ফলে তার শরীর ঝলসে যায়। গত ২০১১ সালের ১২ আগষ্ট গভীর রাতে জমিজমা নিয়ে পূর্ব বিরোধের জের ধরে শাহজাদপুর উপজেলার বেলতৈল ইউনিয়নের শিবরামপুর দক্ষিণপাড়া গ্রামের সাপু সরকারের পুত্র ইলেকট্রিক মিস্ত্রি আমিরুল ইসলাম (২৫) নিজ বাড়ী সংলগ্ন স্থানে এসিড সন্ত্রাসের শিকার হন। এসিডে তার সর্ব শরীর ঝলসে যায়। পরবর্তী সময়ে এসিডের ব্যাপক ব্যবহার ও সহজপ্রাপ্যতায় আবারো শাহজাদপুরে সন্ত্রাসীদের ঢেলে দেয়া এসিডে দগ্ধ হয় উপজেলার নরীনা ইউপির জয়রামপুর গ্রামের হাজী আব্দুর রউফের পুত্র ফরহাদ হোসেন (৩৫)। গত ২০০৫ সালের এপ্রিল মাসে শাহজাদপুর উপজেলার বেলতৈল ইউনিয়নের শিবরামপুর গ্রামে ঘুমন্ত অবস্থায় একই পরিবারের শিশু নার্গিস (৭), পিতা আকছেদ আলী (৩১) এবং আকছেদ আলীর স্ত্রী বুলু খাতুন(২৭) এসিড সন্ত্রাসের শিকার হন। এভাবে তাঁতসমৃদ্ধ এলাকায় একের পর এক ঘটেই চলেছে এসিড নিক্ষেপের ঘটনা। এদিকে, এসিড সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলার তথ্যে জানা গেছে, ২০০২ সালের অগে অসংখ্য এসিড সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটলেও ২০০২ সালের পরে মামলা দায়ের হয়েছে মাত্র ৭৫টি ও রায় হয়েছে মাত্র ৪ টির। স্থানীয় জুয়েলারি সমিতির নেতৃবৃন্দের মতে, ‘অতীতে অধিকাংশ জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা অলংকার পালিশের কাজ করতে নিজেরা এসিড ব্যবহার করতেন। বর্তমানে একজন ডিলারের মাধ্যমে পাঁচটি অলংকার পালিশের কারখানায় এসিড সরবরাহ করায় এসিড বাইরে যাওয়ার কোন সম্ভাবনা একেবারেই নেই। শাহজাদপুর ব্যবসায়ী ঐক্য পরিষদ এবং ইয়ার্ণ মার্চেন্ট এ্যাসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দের দেয়া তথ্যমতে, বিগত বছরগুলোতে তাঁতশিল্পের সঙ্গে জড়িত রং ও এসিড বিক্রয়কারীরা লাইসেন্স করেনি। সম্প্রতি শাহজাদপুরে এসিড বিক্রেতাদের অনেকেই লাইসেন্স করেছেন। যারা এখোনো লাইসেন্স করেননি তারা অচিরেই লাইসেন্স করবেন। তবে সংশ্লিষ্টদের সহযোগীতা আর যেসব এসিড বিক্রেতাদের লাইসেন্স নেই তাদের মধ্যে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টিতে কার্যক্রম গ্রহণ করা হলে এসিড সন্ত্রাস রোধ সম্ভব হবে। তবে এসিড ব্যবহারকারীদের মধ্যেও ব্যাপক জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা অতীব জরুরী বলেও তারা মতামত প্রকাশ করেন।’ এদিকে, নীর্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে, বিগত সময়ের চাইতে বর্তমানে এসিড ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স গ্রহন বৃদ্ধি পেয়েছে। অভিজ্ঞ মহলের মতে, অত্যন্ত স্পর্শকাতর এসিডের ভয়াবহতা প্রতিরোধে এসিড ক্রয়-বিক্রয় ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরোপিত আইনকানুুন এবং নিয়মনীতির সঠিক প্রয়োগ ও নিয়মিত তদারকি করা হলেই কেবল ভয়াবহ এ সন্ত্রাস থেকে মানুষজন রক্ষা পাবে। অন্যথায় এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে।
    সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট, শাহজাদপুর ২৮ জুলাই, ২০১৯ ০৫:৩৯ অপরাহ্ন প্রকাশিত হয়েছে এবং 509 বার দেখা হয়েছে।
    পাঠকের ফেসবুক মন্তব্যঃ
    জাতীয় অন্যান্য খবরসমুহ
    সর্বশেষ আপডেট
    বিশ্বকাপ ক্রিকেট
    নিউজ আর্কাইভ
    ফেসবুকে সিরাজগঞ্জ কণ্ঠঃ
    বিজ্ঞাপন
    সিরাজগঞ্জ কণ্ঠঃ ফোকাস
    • সর্বাধিক পঠিত
    • সর্বশেষ প্রকাশিত
    বিজ্ঞাপন

    ভিজিটর সংখ্যা
    11721773
    ২১ অক্টোবর, ২০১৯ ০৬:০৪ পূর্বাহ্ন