ধর্ষণ-দুর্নীতি রোধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে এখনইঃ-মুহাম্মদ নাজমুল হক||চৌহালী নিউজঃ
চৌহালী নিউজঃ ওয়েবসাইটে স্বাগতম | যোগাযোগ : ০১৭৭৯-১১৭৭৪৪
২৪ জুন, ২০১৯ ০২:৫১ অপরাহ্ন       রেজিষ্টার করুন | লগইন    

উল্লাপাড়া: শিক্ষা

ধর্ষণ-দুর্নীতি রোধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে এখনইঃ-মুহাম্মদ নাজমুল হক
রায়হান আলী, করেসপন্ডেন্ট(উল্লাপাড়া) ২৩-০৫-২০১৯ ০২:৪৫ অপরাহ্ন প্রকাশিতঃ


ফাইল ছবি

আজ আমরা নারী উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে কথা বলছি। সেমিনার-সিম্পোজিয়াম, সভা-সমিতি করছি। হ্যাঁ-নারীর উন্নয়ন হচ্ছে, ক্ষমতায়ন হচ্ছে। নারীর আর্থ-সামাজিক মুক্তি আসছে। রাষ্ট্রের অনেক বড় গুরুত্বপূর্ণ ও দায়িত্বশীল পদে দায়িত্বপালন করছেন নারীরা। আজ মেয়েরা রাস্তায় বেরিয়ে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করছে।

গার্মেন্টস্সহ দেশের নানা সেক্টরে চাকুরি করছে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজ করছে এবং গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। কিন্তু তারা রাস্তা-ঘাটে, শিক্ষাঙ্গনে, কর্মক্ষেত্রে কতোটুকু নিরাপদ ? বস্তুতঃ তারা কোথাও নিজেদের নিরাপদ বোধ করছে না।

সর্বত্র এক চাপা শংকা আর ভীতির মধ্যে চলাচল করছে তারা। আমরা অভিভাবকরাও যাদের মেয়েরা স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করে বা বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে কাজ করে তারাও সন্তান বাড়িতে বা আবাসস্থলে না ফেরা পর্যন্ত একটা আতংকের মধ্যে থাকি।

টেলিভিশন আর পত্রিকার পাতা খুললেও নারী ও শিশু ধর্ষণের এক বিভীষিকাময় রূপ চোখের সামনে ভেসে ওঠে। গৃহবধু থেকে কিশোরী এমনকি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছোট্ট শিশুটিও রেহাই পাচ্ছে না ধর্ষকদের লোলুপতা থেকে।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) এর এক গবেষণা থেকে জানা যায়- “তৈরি পোষাক কারখানার মোট নারী শ্রমিকের প্রায় এক-চতুর্থাংশ কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির শিকার হন। তবে কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে কর্মস্থলে যাতায়াতের সময়কার ঘটনা যোগ হলে ভুক্তভোগীর হার বেড়ে দাঁড়ায় ৪০ শতাংশ (প্রথম আলো ৮ মে ২০১৯) । এমজেএফ-এর আরেকটি হিসাবে দেখা যায়- চলতি মাসের (মে/২০১৯) প্রথম আট দিনে সারা দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৪১ শিশু।

১৯ জানুয়ারি প্রথম আলোয় প্রকাশিত মানবাদিকার সংস্থা “আইন ও সালিশ কেন্দ্রের” দেওয়া এক পরিসংখ্যানে জানা যায়- গত ৫ বছরে দেশে ৩ হাজার ৫৮৭ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২৭৮ জনকে। আরো উদ্বেগের বিষয় হলো ধর্ষণের শিকার নারীদের মধ্যে ৮৬ শতাংশই শিশু ও কিশোরী। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের প্রথম ১৮ দিনে ২৩টি ধর্ষণ ও ধর্ষণ চেষ্টার খবর প্রকাশিত হয়েছে। এদের মধ্যে ১৫ জনই শিশু ও কিশোরী। এরপরও অনেক ধর্ষণ-নির্যাতনের খবর সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয় না। যা আমরা জানতেও পারি না। তাহলে অবস্থা কতো ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে তা সহজেই অনুমেয়। মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কোন তলানিতে পৌঁছেছি আমরা।

ঘরে বাইরে, রাস্তা-ঘাট, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় কোথাও আমাদের মেয়েরা নিরাপদ নয়। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা যাদের কাছে নিরাপদ থাকবে বলে আমরা আশা করি। সেখানেই কোন না কোন ভাবে সেই শিক্ষকদের দ্বারাই মেয়েরা যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রী ধর্ষণ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রীদের যৌন নির্যাতন, মাদ্রাসা শিক্ষক সিরাজুদ্দৌলা কর্তৃক নুসরাতকে ধর্ষণ ও নৃশংসভাবে হত্যা আমাদেরকে ভীষণভাবে দগ্ধ করে চলেছে নিরন্তর। আমরা দেখছি ধর্ষকরা ক্রমেই অগ্রাসী হয়ে উঠছে। আইন প্রয়োগে শিথিলতা, দলীয় প্রভাব বা আশ্রয়-প্রশ্রয় এবং টাকার বিনিময়ে আইনের ফাঁক গলিয়ে ধর্ষকরা ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে।

ভুক্তভোগীরা অনেক ক্ষেত্রে ভয়ে, লজ্জায় আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে। আমরা দেখেছি অনেক বিক্ষোভ-প্রতিবাদের পরও তনু হত্যার বিচার হয়নি। ২০১৭ সালে টাঙ্গাইলে চলন্ত বাসে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় রূপা খাতুনকে। সেই নিহত রূপা খাতুনের বিচার ১ বছরেরও বেশি সময় ধরে আদালতে ঝুলে আছে। ২০১৫ সালের মে মাসে কর্মক্ষেত্র থেকে ঘরে ফেরার সময় রাজধানীতে গণধর্ষণের শিকার হন পোশাকের দোকানে কাজ করা এক গারো তরুণী। আজ পর্যন্ত সেই মামলাটির বিচার হয়নি। এই যে “বিচার না হওয়া।” এই ধরণের অপকর্ম করে পার পাওয়া যায়। এই ধারণা সমাজে আজ বদ্ধমূল।

এ কারণেই ধর্ষণের পর হত্যা তালিকায় রূপা, তনু, নুসরাতসহ একের পর এক নাম যোগ হচ্ছে। এ তালিকায় আরো যোগ হলো কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর তরুণী নার্স শাহিনুরের নাম। প্রথম রোজার দিনটি বাবা-মায়ের সঙ্গে বাড়িতে কাটাবেন বলে বাসে উঠেছিলেন শাহিনুর। কিন্তু ধর্ষকদের পৈশাচিক লালসা থেকে রক্ষা পেলেন না তিনি। বাস শ্রমিকদের দ্বারা গণধর্ষণের পর হত্যা করা হয় তাকে। কিন্তু এভাবে আর কতো দিন? এবার আমাদের জেগে উঠতে হবে। রুখে দাঁড়াতে হবে ওই সব নরপিশাচদের পৈশাচিকতার বিরুদ্ধে। প্রতিবাদ-প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। ভারতে নির্ভয়া ধর্ষণ নিয়ে গণজাগরণ ও প্রতিরোধের পর নানা ধরণের গবেষণা হয়েছে। সে গবেষণায় গবেষকরা-‘প্রতিকার, প্রতিরোধ এবং প্রতিবিধানের ব্যবস্থা না থাকা-কে’ ধর্ষণের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আসলেও তাই। ধর্ষণ নামক এ মহামারি থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে দ্রুত কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা নিশ্চিত করতে হবে।

এবং ধর্ষকদের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। নুসরাত অন্যায়ের সাথে কোন আপোষ করেননি। নিজের জীবন দিয়ে প্রতিবাদ করেছেন। আমাদেরও প্রতিবাদ করতে হবে তা দেখিয়ে গেছেন। আজ সময় হয়েছে।

স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, গ্রাম-শহর সর্বক্ষেত্রে ধর্ষক ও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। দুর্নীতিবাজরা সমাজে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ধর্ষকদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে থাকে। তাই দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধেও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। দেশের সার্বিক উন্নয়নে দুর্নীতিবাজরাও অনেক বড় বিশফোঁড়া। তাই যেখানেই দুর্নীতি ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটুক না কেন সেখানেই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। সেটা যদি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক কর্তৃক ঘটে তবে গ্রামবাসী-অভিভাবক মিলে স্কুল পাহারা দিতে হবে যেন ধর্ষক ঐ স্কুলে ঢুকতে না পারে। এমনকি ওই গ্রামেও যেন ঢুকতে না পারে।

কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটলে ছাত্র-ছাত্রী মিলে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। যাতে কোন ধর্ষক ক্যাম্পাসে থাকতে না পারে। এমনি করে গ্রাম, শহর দেশের প্রতিটি অঞ্চলে ধর্ষণ-সন্ত্রাস আর দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। কোনভাবেই যেন একজন ধর্ষক অপরাধ করে পার না পায়। কেননা, অপরাধীর কোন দল বা অন্য পরিচয় থাকতে পারে না। তার পরিচয় সে অপরাধী। দেশ আজ এগিয়ে যাচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী নেতৃত্বে মহাকাশে স্যাটেলাইট গেছে, স্বপ্নের পদ্মা সেতু দৃশ্যমান হয়েছে। মেট্ররেল, পাতালরেল তৈরি হচ্ছে। দারিদ্র্যের হার ২১.৮ শতাংশ কমেছে।

মাথাপিছু আয় বেড়েছে ৬ বছরে ৫৪ শতাংশে। এমনিভাবে শিক্ষা, কৃষিসহ নানা সেক্টরে দেশের অভূতপূর্ব উন্নয়ন ঘটেছে। কিন্তু ধর্ষণ-সন্ত্রাস-দুর্নীতি দেশের উন্নয়ন অগ্রগতিকে ম্লান করে দিয়ে চলেছে। তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে কাতর মিনতি ধর্ষকদের জন্য কঠোর আইন করে শাস্তি নিশ্চিতের ব্যবস্থা করুন।

ব্যাংকলুটেরা-ঋণখেলাপীদের শাস্তি দিন। অন্তত একজন ঋণখেলাপীকে দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি দিন। দেখুন দেশের অর্থনীতি তথা ব্যাংক খাত শক্তিশালি হয়েছে। দেশে যত ধর্ষণ, সন্ত্রাস, অনিয়ম ঘটছে তার মূলে রয়েছে দুর্নীতি। কেননা দুর্নীতির কারণেই আইনের সঠিক প্রয়োগ হয় না। দুর্নীতির কারণেই অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। নতুন করে অন্যায় কাজে লিপ্ত হয়। সরকার এটা অনুধাবন করেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। এখন প্রয়োজন কঠোর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতকরণ। কারণ ধর্ষণ-সন্ত্রাস-দুর্নীতি দেশের টেকসই উন্নয়নে সবচেয়ে বড় হুমকি। তাই আইনের প্রতিবিধান জরুরি।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ব্যবস্থাপনা উল্লাপাড়া মার্চেন্টস্ পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ উল্লাপাড়া, সিরাজগঞ্জ ০১৭১৮-৭৮৭০০০


২৩-০৫-২০১৯ ০২:৪৫ অপরাহ্ন প্রকাশিত হয়েছে এবং 231 বার দেখা হয়েছে।

পাঠকের ফেসবুক মন্তব্যঃ

চৌহালী নিউজঃ সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

নির্বাচিত খবরসমুহ
উল্লাপাড়া : আরো খরবসমুহ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ প্রকাশিত
ফেসবুকে চৌহালী নিউজঃ
চৌহালী নিউজঃ ফোকাস
বিজ্ঞাপন

স্পন্সরড অ্যাড

ভিজিটর সংখ্যা
100
২৪ জুন, ২০১৯ ০২:৫১ অপরাহ্ন