বেঁচে থাকার অবলম্বন হারালো আট পরিবার||চৌহালী নিউজঃ
চৌহালী নিউজঃ ওয়েবসাইটে স্বাগতম | যোগাযোগ : ০১৭৭৯-১১৭৭৪৪
১৭ অক্টোবর, ২০১৮ ১২:২৪ পূর্বাহ্ন       রেজিষ্টার করুন | লগইন    

সিরাজগঞ্জ: দূর্ঘটনা

বেঁচে থাকার অবলম্বন হারালো আট পরিবার
অনলাইন নিউজ এডিটর ০২-০৮-২০১৮ ১২:৫৫ পূর্বাহ্ন প্রকাশিতঃ


বেঁচে থাকার অবলম্বন হারালো আট পরিবার

চোখের কোনে জল নেই তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র রিফাতের, নেই কোনো অনুভূতিও। দুই বছর আগে মাকে হারিয়েছে। তখনও অনুভব করতে পারেনি মা হারানোর বেদনা। এখন বাবাকে হারিয়ে সাত বছর বয়সেই এতিম হয়ে পড়েছে রিফাত।


বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী রেশমা খাতুন তাকে নিজের ছেলের মতোই দেখেন। তাকে জড়িয়ে কাঁদছিলেন তিনি। রেশমাও নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা। এ পরিবারটির দিকে তাকিয়ে স্বজন ও প্রতিবেশীরা চোখের পানি ধরে রাখতে পারছিলেন না। 


বুধবার (১ আগস্ট) দুপুরে সিরাজগঞ্জের কাদাই গ্রামে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে নিহত রফিকুল ইসলামের বাড়িতে গেলে এমনই হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।


নিহত রফিকুলের চাচা আবু বক্কার শেখ বাংলানিউজকে জানান, মুদি দোকান চালিয়ে বাবা-মা, ছোট দুই ভাই ও স্ত্রী সন্তানকে নিয়ে এক সঙ্গেই ছিলেন রফিকুল। ছোট দু’ভাই ঢাকায় গার্মেন্টেসে চাকরি করেন। মাত্র ১৮ দিন আগে তার বাবা হাবিবুর রহমান ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। পরিবারের অন্যতম উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে পরিবারটি অসহায় হয়ে পড়েছে। এতিম হয়েছে শিশু রিফাত। দ্বিতীয় স্ত্রীর গর্ভে থাকা সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগে বাবাকে হারিয়ে ফেলেছে।
 

রফিকুলের বাড়ির পাশেই একই ঘটনায় নিহত সপ্তম শ্রেণির ছাত্র সজীব। তার ভ্যানচালক বাবা আব্দুল আলীম প্রতিবন্ধী মেয়েকে বুকে জড়িয়ে কাঁদছিলেন। ভ্যান চালিয়ে একমাত্র ছেলেকে লেখাপড়া করাচ্ছিলেন। সন্তান শোকে মা স্বপ্না বেগম অসুস্থ্য হয়ে পড়েছেন। তাকে স্যালাইন ও ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে। 


কান্নাজড়িত কণ্ঠে আব্দুল আলীম বলেন, “ম্যালা কষ্ট কইর‌্যা বেটাক পড়াইত্যাছিলাম। আশা করছিল্যাম আমি ভ্যান চালাইলেও বেটা চাকরি কইরবো। আল্লায় আমার বুকে আঘাত দিয়্যা ব্যাটারে নিয়্যা গেলো।”


দিনমজুরি করে দুই ছেলেকে পড়াশোনা করাচ্ছিলেন বৃদ্ধ আব্দুস সাত্তার। বড় ছেলে আব্দুল বাছেদ কিছুদিন আগে বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি পেয়েছেন। ছোট ছেলে আমিরুল পড়াশোনা করেন। বয়সের কারণে নিজে তেমন কাজ করতে পারতেন না। আর তাই টঙ দোকানটি কিনেছিলেন। বাড়ির পাশে দোকানটি বসিয়ে তার আয় আর ছেলের আয় যোগ করে সংসার চালাবেন। আর ওই টঙ দোকানটি আনতে গিয়েই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন আব্দুস সাত্তার। 


তাঁত শ্রমিকের কাজ করে দু-ভাইকে লেখাপড়া করাচ্ছিলেন ছানোয়ার হোসেন। বৃদ্ধ বাবা আব্দুল হামিদ শয্যাশায়ী হয়ে পড়ায় পুরো পরিবারের দেখাশোনা করছিলেন মোমিন। বাবা-মা, ভাই, স্ত্রী এবং দুই বছরের ছেলে আরমানকে নিয়ে সুখেই দিন কাটছিলো তাদের। 


চাচা আব্দুস সাত্তারের দোকান সরাতে গিয়ে প্রাণ হারালেন ছানোয়ার। তার মৃত্যুতে অসহায় এ পরিবারটিকে আর দেখার কেউ রইল না। ছোট ভাই আনোয়ার ও ইউনুস কলেজে পড়াশোনা করছেন।


আনোয়ার বলেন, ‘আমাদের সব স্বপ্ন মাটি হয়ে গেছে। আর হয়তো লেখাপড়া করা হবে না। সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিতে হবে।’


এমনইভাবে নিজের পরিবারকে দেখাশোনা করতেন আব্দুল মোমিন। বাবা অসুস্থ্য হওয়ার পর সংসারের বোঝা নিজের কাঁধেই ছিল। মেজ ভাই মনিরুল কাঠ মিস্ত্রির কাজ শিখছেন। ছোট ভাই মামুন লেখাপড়া করছে। সেও ওই দুর্ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীর।


ভ্যানচালক আবু তাহেরের দুই ছেলের মধ্যে আব্দুল্লাহ সপ্তম শ্রেণিতে পড়ালেখা করতো। সেও তার চাচা আব্দুস সাত্তারের দোকান সরিয়ে আনতে সহযোগিতা করতে গিয়ে প্রাণ হারায়। 


তাঁত শ্রমিক আমিনুলের প্রথম ছেলে বিয়ে করার পর থেকে আলাদা সংসার। অপর ছেলে রাজু পাইকপাড়া মডেল হাইস্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র। নিজে তাঁত বুনিয়ে ও স্ত্রীকে দিয়ে সুতা কাটিয়ে অনেক কষ্ট করে ছোট ছেলেকে লেখাপড়া করাচ্ছিলেন তিনি। স্বপ্ন ছিলো বুকভরা। সব স্বপ্ন ভেঙে পুরো পরিবারকে কাঁদিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে প্রাণ হারাল রাজু। 


বাবা মায়ের একমাত্র ছেলে ছিলেন হাবিব। হতদরিদ্র বাবা আবুল হোসেন মনোহরী দোকান চালিয়ে খুব কষ্টে পরিবার নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছিলেন। পড়ার খরচ যোগাতে না পেরে অষ্টম শ্রেণি পাস করার পর হাবিবকে দুবাই পাঠিয়ে দেন। টানা ছয় বছর দুবাই চাকরি করে বেশকিছু টাকা রোজগার করেছিলেন তিনি। 


দেশে ফিরে একতলা পাকা বাড়ি নির্মাণ করেন। পরিশ্রমী হাবিব দেশে এসেও বসে থাকেনি। একটি ফ্যাক্টরিতে তাঁত শ্রমিকের কাজ করছিলো। এক বছর আগে বিয়েও করেন। বাবা-মা-বোন ও স্ত্রীকে নিয়ে খুবই সুখের সংসার ছিল তাদের। প্রায় দেড় মাস আগে তাদের ঘর আলো করে রাফি নামে একটি ছেলে সন্তানের জন্ম হয়। হাবিব আবারও মালয়েশিয়া যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। আগামী সপ্তাহের কোনো একদিন ফ্লাইট হওয়ার কথা ছিল তার। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস-একটি দুর্ঘটনাই পুরো পরিবারটিকে সাগরে ভাসিয়ে দিয়েছে।


কান্নাজড়িত কণ্ঠে হাবিবের বাবা আবুল হোসেন বলেন, ‘আমার ছেলের মতো ভালো ছেলে অত্র এলাকায় একটাও ছিলো না। বাবা-মাকে সে খুব ভালোবাসতো। পরিবারটিকে যত্ন করে গড়ে তুলছিল। এখন আমাদের বেঁচে থাকার আর কোনো অবলম্বন রইলো না।’


এদিকে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে একই গ্রামের আটজন নিহত হওয়ার পর থেকে পুরো কাদাই গ্রাম শোকে স্তব্ধ হয়ে গেছে। বুধবার দিনভর নিহতদের বাড়িতে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের ভিড় জমিয়েছিল। 


সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সরকার মো. রায়হান, কালিয়া হরিপুর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জাকির হোসেন, পার্শ্ববর্তী সয়দাবাদ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নবিদুল ইসলাম, আওয়ামী লীগ নেতারা প্রতিটি পরিবারকে শান্তনা জানাতে আসেন।


বিকেলে আসেন নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো) ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকিরুল ইসলাম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. মনিরুজ্জামানসহ বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা।


দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারকে সহায়তা করতে এগিয়ে আসেন অনেকেই। স্থানীয় ব্যবসায়ী আব্দুর রহমান হিল্টন প্রতি পরিবারকে পাঁচ হাজার টাকা, এক বস্তা চালসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী দেন। সয়দাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নবীদুল ইসলাম নিহত প্রতি পরিবারকে ১০ হাজার করে টাকা বিতরণ করেন। 


অপরদিকে নেসকোর পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ বাবদ নিহত আট ও আহত একটি পরিবারকে এত লাখ টাকা করে মোট নয় লাখ টাকা দেওয়ার ঘোষণা দেন।


০২-০৮-২০১৮ ১২:৫৫ পূর্বাহ্ন প্রকাশিত হয়েছে এবং 169 বার দেখা হয়েছে।

পাঠকের ফেসবুক মন্তব্যঃ

চৌহালী নিউজঃ সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

নির্বাচিত খবরসমুহ
সিরাজগঞ্জ : আরো খরবসমুহ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ প্রকাশিত
ফেসবুকে চৌহালী নিউজঃ
চৌহালী নিউজঃ ফোকাস
বিজ্ঞাপন

স্পন্সরড অ্যাড

ভিজিটর সংখ্যা
100
১৭ অক্টোবর, ২০১৮ ১২:২৪ পূর্বাহ্ন